করোনাভাইরাস ঝুকিঁতে বাংলাদেশ

করোনাভাইরাসে

প্রতিবেশি দেশ ভারত, নেপাল, শ্রীলংকায় সংক্রামক ব্যাধি ‘নভেল করোনাভাইরাসে’ আক্রান্ত ব্যক্তি সনাক্ত করা হয়েছে। তাই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের জনমনে ছড়াচ্ছে এই ভাইরাস আতঙ্ক। অফিস-আদালতে, পথে-ঘাটে, গ্রাম-গঞ্জে, নগরে-বন্দরে রেস্তোরায় এবং আড্ডার স্থানগুলোতে চলছে ভাইরাসটি নিয়ে নানান আলোচনা পর্যালোচনা। বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু চিনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহর থেকে উৎপত্তি হওয়া নতুন করোনাভাইরাস ‘নভেল’।

এদিকে মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ‘চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশে মহামারি আকার ধারণ করা করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে এখনো আসেনি। বাংলাদেশে এখনো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়নি।’

ঝুকিঁতে বাংলাদেশ: ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশও। চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেক গভীর। দেশের বহু মানুষ বাণিজ্যিক কারণে চীনে যাতায়াত করেন। সুতরাং এই ভয়াবহ করোনাভাইরাস বাংলাদেশে যাতে আসতে না পারে সেজন্য বিমান বন্দরগুলোতে বসানো হয়েছে স্বাস্থ্য পরীক্ষার যন্ত্র থার্মাল স্ক্র্যানার। এছাড়া চীন থেকে আসা সব বিমানযাত্রী এবং পণ্য বিশেষ পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।’

তবে শুধু লিফলেট বিতরণ ও সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে দায়সারা দায়িত্ব পালন করছেন সীমান্তবর্তী সব স্থলবন্দর ও চেকপোস্ট কর্তৃপক্ষ। দেশের বিভিন্ন স্থল বন্দরের ইমিগ্রেশনে নামমাত্র মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। অথচ বন্দরের আশপাশে লিফলেট বিতরণ ও দেশের বাইরে থেকে আসাদের প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের কার্যক্রম।

তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, ইমিগ্রেশন দিয়ে প্রবেশ করা দেশি-বিদেশি নাগরিকদের গায়ে জ্বর জ্বর ভাব, শুকনো কাশি, গলাব্যথা, চোখ লাল, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়াসহ করোনাভাইরাসের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে তাদেরকে হাসপাতালে নেয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিভাগকে অবহিত করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে ভারত-বাংলাদেশের সবগুলো আন্তর্জাতিক চেকপোস্টে নিয়োগ করা হয়েছে বিশেষ মেডিকেল টিম। প্রতিবেশি দেশ থেকে যাতে ভাইরাস দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য যাতায়তে দেয়া হচ্ছে কড়াকড়ি।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাসজনিত কোনো অহেতুক তথ্য বা গুজব ছড়াতে না পারে সেদিকেও খেয়াল রাখছে সরকার।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে করোনাভাইরাসের ব্যাপারে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই দিন এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জাহিদ মালেক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘যতটুকু জেনেছি করোনাভাইরাস খুব অল্প সময়ে ছড়িয়ে পড়ে। এটি যাতে বাংলাদেশে আসতে না পারে সে লক্ষ্যে দেশের সব বন্দরে প্রস্তুতি নেয়ার জন্য বার্তা পাঠানো হয়েছে। ভাইরাস ঠেকাতে নেয়া হয়েছে সব ধরনের ব্যবস্থা।’ এছাড়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সতর্ক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড করা হয়েছে। এছাড়া সব জেলা হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড করার জন্য সিভিল সার্জনদেরকে চিঠি পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এদিকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চীনের ‘নভেল করোনাভাইরাসে’ বিশ্বের ৪ হাজার ৬১৬ জন ব্যক্তি আক্রান্ত হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চার হাজার ৫৪৩ জনই হলো চীনের নাগরিক। যাদের মধ্য থেকে ১০৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মাইদুল ইসলাম প্রধান মঙ্গলবার শীর্ষ এক সংবাদপত্রে ‘নভেল করোনাভাইরাসের’ ব্যাপারে সচেতনতা ও করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন।

যেভাবে করোনাভাইরাস ছড়ায়: বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এ ভাইরাসটি একজন মানুষের দেহ থেকে আরেকজন মানুষের দেহে দ্রুত ছড়াতে পারে। করোনাভাইরাস মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমেই এটি একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায়।

লক্ষণ সমূহ:

১. জ্বর ও কাশি।

২. শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া।

৩. অরগ্যান ফেইলিওর বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া।

৪. ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। তারপর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহের মধ্যে দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট।

ভ্রমণসংক্রান্ত পরামর্শ: যেহেতু এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি ভাইরাস এবং এর ভয়াবহতা ও বিস্তার সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জানা এখনো সম্ভব হয় নাই। তাই ভ্রমণকালীন বিশেষ করে চীন থেকে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ থেকে চীনে ভ্রমণকারীগণ সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকার জন্য স্বাভাবিক শ্বাসতন্ত্রের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। অথবা কিছুদিনের জন্য বেশি জরুরী কিছু না হলে চীন ভ্রমণে বিরত থাকাই ভালো।

ভাইরাস থেকে বাঁচতে যা যা করতে হবে:

১. আক্রান্ত ব্যক্তি হতে কমপক্ষে দুই হাত দূরে থাকতে হবে।

২. বারবার প্রয়োজনমতো সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। বিশেষ করে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে কিংবা সংক্রমণস্থলে ভ্রমণ করলে।

৩. জীবিত অথবা মৃত গৃহপালিত/বন্যপ্রাণী থেকে দূরে থাকতে হবে।

৪. ভ্রমণকারীগণ আক্রান্ত হলে কাশি শিষ্টাচার অনুশীলন করতে হবে (আক্রান্ত ব্যক্তি হতে দূরত্ব বজায় রাখা, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা, হাত ধোয়া, যেখানে-সেখানে কফ কাশি না ফেলা)।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থা: ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য ভাইরাস প্রতিরোধ সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রস্তুত করা হয়েছে এবং দ্রুত যোগাযোগের জন্য আইইডিসিআরে মোট চারটি হটলাইন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। (হট লাইন নাম্বারসমূহ: +৮৮০১৯৩৭০০০০১১/ +৮৮০১৯৩৭১১০০১১/ +৮৮০১৯২৭৭১১৭৮৪/ +৮৮০১৯২৭৭১১৭৮৫)।

গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে অবহিত করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের মাধ্যমে প্রেস ব্রিফিং করা হয়েছে। সব জেলার সিভিল সার্জনদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য এবং চিকিৎসার লক্ষ্যে প্রয়োজনে পৃথক ওয়ার্ড/বেডের ব্যবস্থা করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

চিকিৎসা এবং শনাক্তকরণের জন্য গৃহীত কার্যক্রম:

১. দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউতে কর্মরত চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

২. ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

৩. আইইডিসিআর ল্যাবরেটরিতে এই ভাইরাস শনাক্তরকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

৪. WHO এবং US CDC-এর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে চিকিৎসা ও ল্যাবরেটরি শনাক্তকরণে সহায়তা নেয়া হচ্ছে।

৫. আইইডিসিআর Corona Control Room খোলা হয়েছে। সার্বক্ষণিক সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুম বিষয়টি সার্বক্ষণিক মনিটর করছে।

জানা গেছে, চীনে সবথেকে বেশি আক্রান্ত হয়েছে উহান শহরের জনগণ। সেখানে কমপক্ষে বাংলাদেশের ৩০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। তাদের কেউ এখনো আক্রান্ত হয়নি। চীন সরকার ১৪ দিনের মধ্যে কাউকে সেই শহরটি ত্যাগ করতে দেবে না বলে জানিয়েছে। চীনে অবস্থান করা বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা শুরু করেছে সরকার। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে তাদের দেশে ফেরত আনার কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া দেশটিতে বাংলাদেশের দূতাবাস সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্য করছে এমন ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাসট্রিজের (বিসিসিসিআই) ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমানে চীনে নববর্ষের ছুটি চলছে। যে কারনে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীরা আগেই তাদের বাণিজ্যিক আদেশ সম্পন্ন করেছেন। এখন বিষয় হচ্ছে, পণ্য তৈরি ও নির্দিষ্ট স্থানে সময়মত পৌছাবে কী না। বিষয়টি একটু চিন্তার। যদি ভাইরাসটির ভয়াবহতা দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে ব্যবসায় কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বাণিজ্যিক সুরক্ষার বিষয় দুই দেশের সরকার কাজ করবে এটাই আশা করছেন তারা।

এসএম/আওয়াজবিডি


অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
https://www.awaazbd.com/author/oeazq8
mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ