বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার শঙ্কা

বন্যা

বিভিন্ন জেলার নদীর পানি কিছুটা কমলেও এখনও বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন জেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। ভারতের পাশাপাশি চীনের বন্যার পানি বাংলাদেশে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে দেশের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তবে বন্যার বিষয়ে সরকারের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। রোববার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে শেষে কমিটির সভাপতি ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম এসব কথা বলেন। বর্তমানে দেশের ২৮টি জেলা বন্যাকবলিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, চীনের পানি যখন পুরোদমে আসা শুরু করবে তখন বন্যা ভয়াবহ হতে পারে। সরকার আশঙ্কা করছে এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সেভাবে আগাম প্রস্তুতিও সরকারের আছে।

কুড়িগ্রাম: পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের ভরসার মোড় এলাকায় হোসাইন নামে দেড় বছরের এক শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। সে ওই এলাকার রিকশাচালক বাবলু মিয়ার ছেলে। এ নিয়ে গত এগারো দিনে কুড়িগ্রামে একজন প্রতিবন্ধী শিশুসহ পানিতে ডুবে মারা গেল ১৬ জন। বন্যার ফলে ৫৭টি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০ হাজার হেক্টর। বন্যায় ১ হাজার ২৪৫কিলোমিটার রাস্তা, ৪০ কি.মি বাঁধ ও ৪১টি ব্রিজ/কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নলক‚প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯ হাজার ৭৩৪টি। পানিবন্দি আছে প্রায় ২ লক্ষাধিক গবাদিপশু।

নেত্রকোনা: জেলার কলমাকান্দা উপজেলায় বাড়ির পাশে বন্যার পানিতে ডুবে জুবায়ের (৫) নামে এক শিশু মারা গেছে। রোববার বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে শিশুর মৃতদেহটি ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে পরিবারের লোকজন। জুবায়ের উপজেলার কৈলাটি ইউনিয়নের রানীগাঁও গ্রামের মজিবুর মিয়ার ছেলে।

সিরাজগঞ্জ: বন্যায় এ পর্যন্ত ৫টি উপজেলায় ৩৯টি ইউনিয়নের ৩৮৮টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষরা পর্যাপ্ত ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। শহর রক্ষা বাঁধ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪ সেন্টিমিটার কমে রোববার বিপদসীমার ৭৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গ্রামের ১ হাজার ১ শত ২৪ পরিবার সম্পূর্ণ এবং ৭৮ হাজার ৬৯৮ পরিবার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জামালপুর: জামালপুরের বকশীগঞ্জে বন্যার পানিতে ভেলায় খেলতে গিয়ে ডুবে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। রোববার দুপুর ২টার দিকে বকশীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের সূর্যনগর পূর্বপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। তারা হলেন- শাহীন মিয়ার শিশুকন্যা সুজুনী আক্তার (১১) এবং সোলায়মান হোসেনের কন্যা সাথী আক্তার (৮)। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পানিতে ডুবে, শিশু, বৃদ্ধ, কিশোরসহ ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ৩২ সেন্টিমিটার হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ১০৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে ১২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। ৭ উপজেলায় মোট ৬৯৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৬০টি উচ্চ বিদ্যালয়, ৮০টি মাদ্রাসা এবং ৪১টি কলেজ এখনও বন্ধ রয়েছে। জামালপুর রেলস্টেশন মাস্টার মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, বন্যার পানিতে রেলপথ প্লাবিত হওয়ায় জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ এবং জামালপুর-বঙ্গবন্ধু সেতুপূর্ব পর্যন্ত রেলপথে আন্তঃনগর ট্রেনসহ সব ট্রেন চলাচল এখনও বন্ধ রয়েছে। বন্যার পানিতে এ পর্যন্ত ২৫ হাজার ৮৪৫ হেক্টর জমির ফসল প্লাবিত হয়েছে।

রাজবাড়ী: গোয়ালন্দ পয়েন্টে পদ্মার পানি বিপদসীমার ৬৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৩ হাজার হাজার পরিবার। প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। উঁচু স্থানে ও শহর রক্ষা বাঁধের ওপর আশ্রয় নিচ্ছে মানুষ। মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে পশু খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির।

ফরিদপুর: চরভদ্রাসনে ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্যাকবলিত হয়েছে। পানির কারণে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসতে না পারায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। অনেক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছে বন্যাকবলিত অসহায় মানুষ।

শেরপুর: শেরপুর-জামালপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের কজওয়ে তলিয়ে থাকায় টানা ৩ দিন যাবত সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ফলে বাড়ছে ফসল ও মৎস্য সম্পদসহ নানা ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ। বন্যায় জেলার বিভিন্ন পুকুর, জলাশয়, খামারের মাছ ভেসে ও পাড় ভেঙে প্রায় ৫ কোটি ১৮ লাখ টাকার মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া জেলায় ৭৪৭ হেক্টর রোপা আমন ধানের বীজতলা ও ১২৫ হেক্টর সবজি ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। আর পানি ওঠায় ৭ দিন যাবত জেলায় ৫৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

গাইবান্ধা: ব্রহ্মপুত্রের পানি কিছুটা হ্রাস পেয়ে বিপদসীমার ১০১ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ ছাড়া করতোয়া নদীর পানি নতুন করে বৃদ্ধি না পেলেও এখনও বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর বাঁধ ভাঙা পানি এখনও নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। তবে বন্যাকবলিত এলাকার পানিবন্দি পরিবারগুলোর মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি সংকট, স্যানিটেশনের অব্যবস্থা, গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। গাইবান্ধা ও গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভা এবং জেলার ৪৯টি ইউনিয়নের ৩৮৩টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৩২৮ জন। ৪৪ হাজার ৭৯২টি বসতবাড়ি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


mujib_100
ads
আমাদের ফেসবুক পেজ
সংবাদ আর্কাইভ