/ins>

ভারত – বাংলাদেশ সীমান্তে ৪ মাসে হতাহত ১৭

মাহমুদা ডলি ,বাংলাদেশ ব্যুরো:
চলতি বছরে গত ৪ মাসের মধ্যেই ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ  কর্তৃক ১৭ জন বাংলাদেশীকে হত্যা, গুলিসহ অপহরণের ঘটনা ঘটেছে।  একইসঙ্গে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বেআইনীভাবে  অনুপ্রবেশ,  হত্যা,  নির্যাতন  ও  লুটপাট  অব্যাহত  রেখেছে।  অথচ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফের মধে ̈ অনুষ্ঠিত  ৪৬ তম সীমান্ত  সম্মেলন উপলক্ষে  গত  ২৬  এপ্রিল  এক  যৌথ সংবাদ  সম্মেলনে ভারতীয়  সীমান্ত  রক্ষীবাহিনী  বিএসএফের মহাপরিচালক কে কে শর্মা বলেন, চলতি বছর এখন পর্যন্ত সীমান্তে কোনো হত্যার ঘটনা ঘটেনি।  কিন্তু ওই বক্তেব্যর জবাবে বাংলাদেশ থেকে কোন প্রতিবাদ কেউ করেননি ।

অথচ মানবাধিকার সংগঠন অধিকার. বিভিন্ন গনমাধ্যমে পরিসংখ্যানে বলছে যে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী সীমান্তে কদম আলী, লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম সীমান্তে মনজুরুল আলম এবং ফেব্রুয়ারি মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার  শিবগঞ্জে শরীফুল ইসলাম এই তিন বাংলাদেশী নাগরিক বিএসএফ’র হাতে নিহত হয়েছেন ।
বিএসএফ মহাপরিচালকের দেয়া অসত্য তথ্য ̈  সীমান্তে বিএসএফ এর হত্যাযজ্ঞ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে ন্যায্যতা দেবে বলে  অধিকার মনে করে। শুধু তাই নয় , এই সময়ের মধ্যে গুলিওে অপরণসহ ১৭টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বিএসএফ কর্তৃক।

এমনকি বিএসএফ -বিজিবির যৌথসভার দুইদিন আগেই অর্থাৎ ২৩ এপ্রিল পেট্রাপোলে বিএসএফের নির্মমতার শিকার বাংলাদেশি অন্তঃসত্ত্বা নারী ।  ভারত সীমান্তে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক বাংলাদেশি নারীকে মারাত্মক হয়রানি করেছে পেট্রাপোলের একজন অভিবাসন বিষয়ক কর্মকর্তা।

/ins>

হয়রানির শিকার ওই নারীর নাম অর্পিতা। তার বিয়ে হয়েছে কলকাতার আনন্দ দাশগুপ্তের সঙ্গে।
শনিবার তিনি পেট্রাপোলে হাজির হলে তাকে উত্তপ্ত রোদের ভিতর টানা ৮ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। শুধু তা-ই নয়। এ সময় তাকে নানাভাবে হয়রান ও নির্যাতন করা হয়।
অর্পিতার পাসপোর্ট অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে। এ জন্য তাকে ভারতে প্রবেশ করতে দিচ্ছিলেন না ওই কর্মকর্তা। এক পর্যায়ে অর্পিতার শরীর থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। আতঙ্ক দেখা দেয় যে, এতে তার গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি হতে পারে। এ বিষয়ে একটি মামলা করেছেন অর্পিতার স্বামী আনন্দ দাশগুপ্ত। তাতে তিনি বলেছেন, অভিবাসন বিষয়ক কর্মকর্তারা তার স্ত্রীর কাছে ঘুষ দাবি করেছিলেন। তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে তার স্ত্রীকে হয়রানি করা হয়েছে।

/ins>

অধিকার গত ৩মে  এক প্রতিবেদনে বলছে যে, ‌সীমান্তে বাংলাদেশের জনগনের ওপর চলতি বছরের গত ৪ মাসে ৩জনকে হত্যা গুলিতে আহত এবং অপহরণসহ ১৭টি  মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে বিএসএফ।
” বিএসএফএর মহাপরিচালক তথা ভারত সরকারকে এই মর্মে স্মরণ করিয়ে দিতে  চায়  যে,  ২০১৭  সালের  জানুয়ারি  থেকে ওই  বছরের ডিসেম্বর  পর্যন্ত ২৫  জন  বাংলাদেশীকে বিএসএফ হত্যা করেছে, যার মধ্যে রয়েছে দুইজন শিশুও ।

সীমান্ত হত্যা চলছেই :

/ins>

ব্যাপক সমালোচনা সত্ত্বেও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিরস্ত্র মানুষের উপর গুলিবর্ষণ বন্ধ হয়নি।  বিএসএফ–এর হাতে গত ২০১৭ সালে ২৫ জন নিহত হয়েছেন।   ২০১৬ সালে  সীমান্তে ৩১ বাংলাদেশি নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।  একই সময়ে অপহৃত হয়েছেন ২৪ জন বাংলাদেশি।  গত বছর নিহতদের মধ্যে ২৩জনকে গুলি করে এবং সাতজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী,  ২০১৫ সালে সীমান্তে নিহত হয়েছে ৪৪জন, ২০১৪ সালে ৩৫ জন, ২০১৩ সালে ২৯ জন এবং ২০১২ সালে ৩৮ জন।

/ins>

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০১৭ সালের ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সীমান্তে বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিকদের হাতে মারা গেছেন ৯৩৬ জন বাংলাদেশি। এর মধ্যে বিএসএফের হাতে ৭৬৭ জন ও ভারতীয়দের হাতে ১৬৯ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

বিজিবির তথ্য দেওয়া তথ্য মতে, ২০০৯ সালে ৬৭ জন, ২০১০ সালে ৬০ জন, ২০১১ সালে ৩৯ জন, ২০১২ সালে ৩৪ জন, ২০১৩ সালে ২৮ জন, ২০১৪ সালে ৪০ জন, ২০১৫ সালে ৪৫ জন, ২০১৬ সালে ৩১ জন এবং ২০১৭ সালের ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২১ জন নিহত হয়েছেন।

সীমান্ত হত্যা: প্রতিশ্রুতি অনেক, বাস্তবতা ভিন্ন :
সীমান্তে হত্যাকান্ড বন্ধে কোনো প্রতিশ্রুতিই রাখছেনা ভারত। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ, হত্যাকান্ড শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনাসহ নানা প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও বন্ধ হচ্ছে না বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা। প্রতিমাসেই ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিক হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
এসব হত্যার প্রতিবাদে মাঝেমধ্যে পতাকা বৈঠক ডাকে বিজিবি। সব সময় নিয়ম মাফিক বৈঠক হয়। কিন্তু হত্যা বন্ধ হয় না। এমনকি হত্যার পর সব সময় লাশও ফেরত দেয় না বিএসএফ। নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের গুলি করে হত্যা ও অবৈধভাবে বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা সীমান্ত এলাকার মানুষের কাছে। তবে এসব হত্যাকান্ডে তেমন উদ্বিগ্ন নয় বাংলাদেশ সরকার। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, সীমান্ত হত্যা দুদেশের সম্পর্কে কোনো প্রভাব বিস্তার করবে না।

আইন ও সালিস কেন্দ্রের সাবেক ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক, মানবাধিকার কর্মী নূর খান গনমাধ্যমকে বলেছেন, ‘ভারত সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখেনি। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম বিভিন্নভাবে সরকারের কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছে। দ্বিপাক্ষিক সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ভারত বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেটি রাখেনি।’

তিনি বলেন, ‘তারা (ভারত) বলেছিল, সীমান্তে মারণাস্ত্র ব্যবহার করবে না। কিন্তু আমরা দেখলাম, সেটি মুখের বুলি হলো। এখনও প্রতিনিয়ত সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহতের ঘটনা ঘটছে।’

সীমান্ত হত্যার জন্য ভারত তোষণনীতিই দায়ি:  ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বেআইনীভাবে  অনুপ্রবেশ,  হত্যা,  নির্যাতন  ও  লুটপাট  অব্যাহত  রেখেছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারসহ পর্যবেক্ষকমহল বলছে, বাংলাদেশী নাগরিকদের উদ্দেশ্যমূলকভাবে হত্যা করা মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। বিএসএফের হত্যাযজ্ঞ বন্ধে ভারত সরকারের সঙ্গে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে বিএসএফ কর্তৃক হত্যাকান্ডের সরেজমিন অনুসন্ধান ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রন্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে ভারত সরকারকে বাধ্য করতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খান বলেন, ‌‌”হত্যাকাণ্ড যে বন্ধ হচ্ছে না, সেটি একটি ভয়াবহ ব্যাপার। “এখনো কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সহিংস সীমান্ত। ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সীমান্তও হয়তো এতো সহিংস নয়।“
তিনি বলেন, প্রতিবেশী একটি দেশে হত্যা করার সুযোগ ভারতীয় বিএসএফ যেভাবে পেয়ে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিরোধ দৃঢ় না হওয়ার কারণেই এটি এখনো চলছে।  আর শুধু বর্তমান সরকারের ভূমিকাও প্রচণ্ড দুর্বল ও নতজানু নীতিতেই রয়েছে।  ” অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভারতের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত হয়তো মাঠপর্যায়ে ঠিকমতো পৌছায় না বলে সীমান্ত হত্যাকান্ড এখনো বন্ধ হচ্ছে না।

Comments With Facebook