/ins>

যে কারণে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করার দাবি যৌক্তিক

শাহ আহমদ সাজ

পড়ালেখা শেষ করে ক্যারিয়ার নিয়ে বাংলাদেশে ভাবতে হয় কমবেশি সবারই। একজন ছাত্রের যেমনটি ভাবায় তেমনি পরিবারের সদস্যদের।এই ক্যারিয়ার গড়তে গিয়ে মাঝপথে অনেক শিক্ষার্থী হোঁচট খান আবার অতিরিক্ত চিন্তায়, পারিবারিক বিষয় মাথায় রেখে আমাদের দেশে ভালোভাবে বেঁচে থাকাও দায়।

এর পেছনে অনেক যুক্তিও আছে যেমন তেমনি উদহারণও কম নয়। বাংলাদেশে বেকারত্ব বাড়ছে প্রতিনিয়ত।শুধু ঢাকা শহরেই বেকারের সংখ্যা হবে ২৬ লাখ।বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী জনসংখ্যা ১৭ কোটি। এর মধ্যে ১০ কোটি মানুষ রয়েছে কর্মক্ষম। তার ভেতর পাঁচ কোটি মানুষ কাজ পেয়েছে। বাকি পাঁচ কোটি মানুষ কোনো কাজ পায় না।

এদিকে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে প্রায় চার কোটি লোক বেকার। এ হিসাবে শিক্ষিত বেকারের পাশাপাশি অশিক্ষিত বেকারও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কর্মসংস্থানের হারও কমেছে। একই সঙ্গে বেকার হচ্ছে কর্মজীবীরাও।বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী বেকারের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ২ কোটি ৪৪ লাখ।যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্টের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার।

/ins>

এই বেকারত্ব থেকে গত কয়েক বছর ধরেই সরকারি চাকুরির বয়স ৩৫ করার বয়স বাড়ানোর দাবিতে তাঁদের জমায়েত কখনো জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে, কখন শাহবাগ মোড়ে। শনিবারও (১০ মার্চ) তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি দিতে গিয়ে বাংলামোটর এলাকায় পুলিশের হাতে মার খেয়েছেন। আন্দোলনরত মেয়েদের নির্যাতিত হওয়ার দৃশ্য আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি।আন্দোলনকারীদের প্রতি পুলিশের পেশাদারিত্বের প্রশ্নটি সামনে চলে এসেছে।

/ins>

যে কারণে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করার দাবি যৌক্তিক: 

গতকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি খবর এবং ছবি ভাইরাল হওয়ার পর থেকে এই আন্দোলন নতুন মোড় নিয়েছে। জাতীয় প্রেসক্লাবের মূল ফটকে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ’ নামের সংগঠন বা যারা এই আন্দোলন করছে তাঁদের খবর খুব বেশি মিডিয়া কাভারেজ পাচ্ছে না।প্রেসক্লাবের সামনে আরও কয়েকটি সংগঠন তাদের দাবিদাওয়ার জানান দিতে এসেছিল। এর মধ্যে আয়োজনটি ছিল ছোট পরিসরে।

/ins>

এই তরুণ-তরুণীরা অনেক দিন ধরেই কথা বলে চলেছেন। কখনো সমাবেশ, কখনো মানববন্ধন, কখনো অবস্থান ধর্মঘট করে তাঁরা সদাশয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

তাঁদের দাবি , চাকুরী জীবিদের বেতন না বাড়িয়ে ২৬ লাখ শিক্ষিত বেকার যুবকদের চাকুরীর সুযোগ করে দিলে কি ভাল হতো না? অবসরের বয়স সীমা ২ বছর না বাড়িয়ে, বেকারদের চাকুরীর বয়স ৩৫ করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিলে কি পাপ হতো? বিবেকের কাছে প্রশ্ন যেখানে লাখ লাখ বেকার কর্মসংস্থানের অভাবে পরিবার তথা সমাজের বোঝা হয়ে আছে । অবহেলিত ,ভীষন্ন ও ধিক্কার যাতনায় হতাশ জীবন-যাপনের মধ্যে দিয়ে মৃত্যু যন্ত্রনার মত উপলবদ্ধি করছে প্রতিটি মূহুর্ত । বেকার জীবনের বাসিন্দারা মনে করেন পৃথিবীতে জন্ম হওয়াটাই কোন অভিশাপ।চাকুরীতে আবেদন করার জন্য ট্রেজারী,ব্যাংক ড্রাফের টাকাটাও হাত পেতে আনতে হয় পরিবারের কাছ থেকে অতঃপর বিবিধ খরচ তো আছেই।তাঁদের এই দাবির সাথে আমি একমত।

/ins>

বর্তমান বিধি অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছর। তবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ক্ষেত্রে তা ৩২। অর্থাৎ সাধারণ ক্ষেত্রে বয়স ৩০ বছর পার হলে আর কেউ সরকারি চাকরির জন্য দরখাস্ত করতে পারবেন না। তাঁকে দৌড়াতে হবে বেসরকারি চাকরি, ব্যবসা বা অন্য কোনো উপায়ে রুটিরুজি জোগাড়ের দিকে।কিন্তু বেসরকারি চাকরিতেও এখন ঘোষ বাণিজ্য ঢোকে গেছে।যতদূর মনে পড়ে আমেরিকায় আসার পর তার কয়েকমাস যেতে না যেতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বন্ধু ফোন করে বলল যে, একটি প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরি হয়েছে তবে গুনতে হবে কয়েক লক্ষ টাকা।কি আর করা সেই চাকরির জন্য বন্ধুকে সাহায্যের জন্য দিলাম কিছু ডলার।তখন ভাবছিলাম ভাগ্যিস প্রবাসে চলে এসেছি তা না হলে আমাকেও কাজটি পেতে কাউকে না কাউকে ধরতে হতে হলো।

তাই বেকার বুঝে বেকারত্বের কষ্ট। আর দেশে সেশনজটের যে বেড়া তা ডিঙিয়ে তাঁদের স্নাতক/স্নাতকোত্তর শেষ করতেই বয়স ২৭ বা ২৮ হয়ে যায়। তাই চাকরিতে প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে নিতেই বয়স ৩০-এর কাছাকাছি এসে পড়ে।একটা সময় বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ছিল ২৭ বছর। পরে এটা বাড়িয়ে ৩০ করা হয়। তার মানে কমানো-বাড়ানোর সুযোগ সব সময় আছে। আর দেশে সরকারি চাকরি পাওয়া মানে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া।

বিশ্বের অনেক দেশই  যেমন আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত সেখানে চাকরিভেদে সরকারি চাকরিতে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৪ থেকে ৪০ বছর। আরেক প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কায় তা আরও পাঁচ বছর বেশি।এছাড়া উন্নত বিশ্বে যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডায় যেকোন বয়সেও চাইলে চাকরিতে ঢোকা যায়।এবার ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যায় ইতালি ও নরওয়েতে এ বয়স ৩৫। ফ্রান্সে ৪০, আর সুইডেনে ৪৭ বছর। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের উন্নত দেশগুলো ৫৫ বছর পর্যন্ত তার নাগরিকদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।

বাংলাদেশে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর প্রসঙ্গ আসছে প্রধানত সেশনজটের কারণে। একজন শিক্ষার্থী যদি ২৩ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারতেন, তাহলে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩০ বেঠিক ছিল না। কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষ করতে আরও দুই–তিন বছর বেশি লাগছে। তাঁদের মধ্যে গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের যন্ত্রণাটা আরেকটু তীব্র। তাঁরা গড়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কলেজের তুলনায় ছয় মাস থেকে এক বছর পিছিয়ে পড়ছেন।

যদিও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন সেশনজট তুলনামূলক কম। ১৯৮০ এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বেরোতে একজন শিক্ষার্থীর ছয় থেকে সাত বছর লাগত। রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যুর কারণে এই সেশনজট ছিল রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চরম। এখন স্নাতক চার বছর হওয়ার পরেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা গড়ে ছয় বছরের মধ্যে বেরোতে পারছেন। কোথাও কোথাও আরেকটু বেশি লাগছে বটে।

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর জন্য যারা আন্দোলন করছেন, এই তীব্র রোদে দুপুরে পুলিশের লাঠির আঘাত সহ্য করছেন, আটকের শিকার হচ্ছেন, তাঁদের প্রতি এবং এই আন্দোলনে এমনিতেই সহানুভূতি চলে আসে। তবে দাবি আদায়ের জন্য ব্যস্ত সড়ক আটকে নাগরিক জীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করাও কাম্য নয়।

আমি মনে করি, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা শিথিল রেখে কেউ যদি ৩৮-৪০ বছর বয়সে সব ধরনের পরীক্ষায় উতরে সরকারি চাকরিতে আসতে চান, তাঁর যদি সব ধরনের যোগ্যতা থাকে, তাহলে তাঁর অধিকার হরণ করার কোন যুক্তিক কারণ থাকতে পারে না।

বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট এবং হন্য হয়ে বছরের পর বছর চাকরি খোঁজা।  যদি এই সেশনজট কমিয়ে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি থাকতো তাহলে আর এই আন্দোলনকারীদের দাবির সারবত্তা থাকে না। সেশনজট এবং চাকরির জন্য হাহাকার আছে বলেই এই দাবিটা আসছে।

আমি মনে করি বিষয়টি নিয়ে সরকারের ভাবার সময় এসেছে। এইসব আন্দোলনরত ছেলে মেয়েদের সাথে আলোচনা  হওয়া, কথা বলা জরুরি। আলোচনা হোক সরকারি অথবা বেসরকারি মহলে। সেমিনার, গোলটেবিলে বিস্তর আলোচনা করে এই সমাধানের পথ সরকারকেই বের করা মঙ্গলজনক।

লেখক: সাংবাদিক, সম্পাদক, সাপ্তাহিক।

Comments With Facebook