/ins>

আবারো নির্বাচন হাইজ্যাকের অশুভ তৎপরতা

সৈয়দ আবদাল আহমদ

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেশী ভারতের অতি উৎসাহী তৎপরতা আবার লক্ষ করা যাচ্ছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচনে কোন দলের বিজয় লাভ করা উচিত কিংবা উচিত নয়, এ নিয়ে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের রীতিমতো মাথাব্যথা শুরু হয়েছে। এমনকি ভারতের ক্ষমতাসীন সরকারও লজ্জা-শরম বাদ দিয়ে এর সাথে জড়িত হচ্ছে।

অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন (ওআরএফ) নামে একটি ভারতীয় থিংকট্যাংক সম্প্রতি বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ডিস্টিংগুইশড ফেলো সাংবাদিক মনোজ যোশী এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। বিবিসির রিপোর্টে বলা হয়, এই বিশ্লেষণে মনোজ যোশী মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনাকে ভারত উদ্বেগের চোখে দেখে।’ সোজা কথায় তিনি বলতে চাচ্ছেন, ভারত আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় দেখতে আগ্রহী, অন্য কারো নয়। অন্য দল বিজয়ী হলে সেটা তাদের উদ্বেগের কারণ। এর পূর্ণ অর্থ দাঁড়ায়, বাংলাদেশের ক্ষমতায় যে সরকার আসীন হবে তাকে ভারতের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের স্বার্থ কিংবা দেশের জনগণের স্বার্থের বিষয়টি সেখানে গৌণ। বিশ্লেষণে তিনি আরো লিখেন, ‘২০১৪ সালে বাংলাদেশে যে নির্বাচন হয়, তাতে মাত্র ২২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। সেই নির্বাচন বিএনপি বর্জন করে এবং সে সময় অনেক সহিংসতা হয়। কাজেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আশা, এবারের নির্বাচন যেন আগেরবারের চেয়ে বিশ্বাসযোগ্য হয়।’

অর্থাৎ মনোজ যোশীর আশা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকেই ক্ষমতায় আনতে হবে। তবে দেখতে হবে, ৫ জানুয়ারির মতো বিতর্কিত নির্বাচনে যেন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাসীন করা না হয়। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে যেন বিশ্বাসযোগ্য করে ক্ষমতায় আনা হয়। নির্বাচনটি যেন এমনভাবে হয় যাতে বিএনপিও অংশ নেয়, বিশ্বাসযোগ্য হয় এবং আওয়ামী লীগও ক্ষমতায় আসে।
অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের এই বিশ্লেষণ প্রকাশের পরপরই দেখা গেছে, ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির আমন্ত্রণে আওয়ামী লীগের ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ভারত সফর করেছে।

/ins>

প্রতিনিধিদলে নেতৃত্ব দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। আওয়ামী লীগের এই প্রতিনিধিদল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে সার্টিফিকেট দেন যে, বাংলাদেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তার ভাষায়- ‘আজ কোথায় বাংলাদেশ, আর কোথায় পাকিস্তান।’ প্রতিনিধিদলটি বিজেপি কার্যালয়ে বিজেপি নেতৃবৃন্দের সাথেও বৈঠক করেন। এতে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধব, অরুণ সিং ও রামলালের মতো বেশ কয়েকজন শীর্ষনেতা উপস্থিত ছিলেন। বিজেপির ভাইস প্রেসিডেন্ট বিনয় সহস্রবুদ্ধে বিবিসিকে বলেন, ‘বিজেপি দলীয় স্তরে সংযোগকে কতটা গুরুত্ব দেয়, আওয়ামী লীগকে ভারতে আমন্ত্রণ জানিয়ে এ বৈঠক করাই তার প্রমাণ।’ বিজেপি চার বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকলেও আওয়ামী লীগকে দলীয়ভাবে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানায়নি। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটিকে এবার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এখানেই ভারতের স্বার্থের বিষয়টি স্পষ্ট।

/ins>

এর আগে কংগ্রেসের আমন্ত্রণে সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা ড. আবদুর রাজ্জাক ও ডা: দীপু মনির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ভারত সফর করে। বিজেপির সাম্প্রতিক আমন্ত্রণ সম্পর্কে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তারা মন্তব্য করেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের সামনে নরেন্দ্র মোদি যেভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করলেন, সেটা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং সাংবাদিক মনোজ যোশীর মন্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনটিও হাইজ্যাক করার নীলনকশা প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে এবং এর আলামত ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। মনোজ যোশী স্পষ্টভাবেই বলেছেন, বিএনপির ব্যাপারে ভারত সন্দিহান। তার মতে, আগে যে দুই দফা বিএনপি ক্ষমতায় ছিল (১৯৯১-৯৬, ২০০১-২০০৬) সে সময় নাকি বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদ শেকড় গেড়েছিল এবং ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পাকিস্তানের সমর্থন পেয়েছিল। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্য ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের এমন অজুহাত আগেও লক্ষ করা গেছে। বাংলাদেশের জনগণ ভালোভাবেই জানে, ‘জঙ্গিবাদ’ ও ‘ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী’ ইস্যু দু’টি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং ভারতের যৌথ প্রকল্প। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে কিংবা ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা দেখা দিলেই আওয়ামী লীগ এই প্রপাগান্ডা শুরু করে। বিএনপির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে, জঙ্গিবাদের মদদদাতা হলো আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ঢাকায় সফরে এলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জঙ্গিবাদ বিষয়ে পুস্তিকা প্রকাশ করে বিলি করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। বিএনপি ক্ষমতায় এসে জঙ্গিবাদ নির্মূল করেছিল। বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমানসহ অনেক জঙ্গি নেতাকে সে সময় গ্রেফতার করে বিচার করা হয়েছিল। তাদের সংযোগ ছিল বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সাথে। শায়খ আবদুর রহমান তো একজন আওয়ামী লীগ নেতার আত্মীয়ও (দুলাভাই) ছিলেন।

/ins>

মনোজ যোশী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিনা ভোটের নির্বাচনটি সম্পর্কে বলেন, ২২ শতাংশ ভোট পড়ার কারণে নাকি এই নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। তিনি আরো মন্তব্য করেন, ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। কিন্তু তার এ তথ্যও মনগড়া। প্রকৃতপক্ষে ওই নির্বাচনটি ছিল একটি ভোটারবিহীন নির্বাচন। নির্বাচনে ১৫৪টি আসনে (প্রথমে ১৫৩ এবং পরে একটি) কোনো ভোটই হয়নি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীদের নির্বাচিত বলে ঘোষণা দেয়া হয়। বাকি ১৪৬টি আসনে গড়ে ৫ শতাংশ ভোটও পড়েনি। ওই নির্বাচন শুধু বিএনপিই নয়, সব বিরোধী রাজনৈতিক দল বয়কট করেছিল। এমনকি জাপা চেয়ারম্যান এরশাদও নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন। কিন্তু তাকে র‌্যাব-পুলিশ দিয়ে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার নামে সিএমএইচে জোরপূর্বক আটকে রেখে নির্বাচনে জাপার অংশগ্রহণ দেখানো হয়। ওই নির্বাচন দেশী-বিদেশী কোনো পর্যবেক্ষক সংস্থাই পর্যবেক্ষণ করেনি। একমাত্র ভারত ছাড়া অন্য কোনো দেশ এ নির্বাচনকে বৈধতা দেয়নি। নির্বাচনের ইতিহাসে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করে। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক বিশ্বকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এটি একটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। কিছু দিন পর সব দলের অংশগ্রহণে আরেকটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা হবে। শেখ হাসিনার এ আশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অনুরোধে বিএনপি আন্দোলন স্থগিত করেছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেই নির্বাচন আর হয়নি। ক্ষমতাসীনেরা র‌্যাব-পুলিশ দিয়ে দমননীতি চালিয়ে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে। সেই কর্তৃত্ববাদী শাসন এখনো অব্যাহত আছে।

ভারত সফর শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রতিনিধিদল নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। বিমানবন্দরে ওবায়দুল কাদের বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপ আওয়ামী লীগ আশা করে না। তার কথার অর্থ হচ্ছে, তারা যেভাবে চান, সেভাবে নির্বাচন হবে। বহির্বিশ্ব বলতে তারা ভারত ছাড়া অন্য দেশগুলোকে বুঝিয়ে থাকেন। তার কথার মর্মার্থ হচ্ছে, ভারত ছাড়া অন্য কোনো দেশ যেন নির্বাচন নিয়ে কথা না বলে। যা কিছু করার অধিকার, সেটা শুধু যেন ভারতেরই আছে; অন্য কারো নয়।

/ins>

ওবায়দুল কাদের তার বক্তব্যে বারবার উচ্চারণ করেন, ‘আমাদের ক্ষমতার উৎস দেশের জনগণ। দেশের জনগণই নির্ধারণ করবে কে ক্ষমতায় থাকবে, কে থাকবে না।’ তার এ বক্তব্য কি হাস্যকর নয়? আওয়ামী লীগের ক্ষমতার উৎস যদি জনগণই হয়ে থাকে, তাহলে তারা নির্দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে ভয় পাচ্ছে কেন? আগের মতো এবারো ভারতের সহযোগিতা পাওয়ার জন্য এত দৌড়ঝাঁপ করছে কেন? ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তারা জনগণকে ভোট দেয়ার সুযোগ দেয়নি কেন? ভোটারবিহীন নির্বাচনী প্রহসন কেন তারা করল? কেনই বা তারা ক্ষমতা কব্জা করার পর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয় এবং সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে? সেনাবাহিনীকে নির্বাচনী দায়িত্ব দিতে কেন তাদের অনীহা? এসব পদক্ষেপ কি জনগণকে উপেক্ষা নয়? প্রকৃতপক্ষে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার উৎস জনগণ নয়, ভারত। প্রতিবেশী ভারতের সহযোগিতা ও র‌্যাব-পুলিশকে ব্যবহার করে তারা ক্ষমতায় থাকতে চায় এবং নির্বাচন হাইজ্যাক করে বারবার ক্ষমতায় আসতে চায়।

আওয়ামী লীগের ক্ষমতার উৎস যে ভারত, তা সে দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির লেখা বইটিই একটি বড় প্রমাণ। তিনি তার ‘কোয়ালিশন ইয়ার্স’, বইয়ে নিজেই সেটা বর্ণনা করেছেন। তার সেই বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং ১৯৯১-৯৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলনে ভারত বিশেষ করে প্রণব মুখার্জির বিশেষ ভূমিকা ছিল। প্রণব মুখার্জি তার বইয়ের ১১৪ নম্বর পৃষ্ঠায় লেখেন, ‘২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ছয় দিনের সফরে ভারতে আসেন। আমার সাথে তিনি দেখা করেছিলেন। তার সাথে আলাপচারিতায় আমি তাকে রাজনৈতিক বন্দীদের ছেড়ে দেয়ার পরামর্শ দেই। মইন আমার কাছে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করলেন, শেখ হাসিনাকে ছেড়ে দেয়া হলে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে তাকে চাকরিচ্যুত করবে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নিলাম। জেনারেলকে নিশ্চয়তা দিয়ে বললাম, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে আপনার চাকরির কোনো সমস্যা হবে না। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রণব মুখার্জি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। আর বাংলাদেশে নির্বাচন হয় একই বছরের ডিসেম্বরে। অর্থাৎ ১০ মাস পর। তাহলে নির্বাচনের ১০ মাস আগে ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের সেনাপ্রধান নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে কিভাবে এত নিশ্চিত হতে পারলেন? সেই নির্বাচনে শেখ হাসিনাই ক্ষমতায় আসেন। জেনারেল মইনকে সেনাপ্রধানের দায়িত্বে বহাল রাখা হয় এবং জরুরি সরকারের শাসনকে বৈধতা দেয়া হয়। সেই নির্বাচন যে ছিল ভারতীয় হস্তক্ষেপ এবং সেনাসমর্থিত জরুরি সরকারের সাথে আওয়ামী লীগের একটি আঁতাতের নির্বাচন, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে? ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং নির্বাচনে কিভাবে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন, তার প্রমাণ বাংলাদেশের গণমাধ্যম। সেই ঘটনাগুলো মানুষ ভুলে যায়নি। একইভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আন্দোলনে কঠোর অবস্থানে থাকার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পরামর্শও শেখ হাসিনাকে দিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। তিনি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন।

ভারতীয় হস্তক্ষেপের প্রমাণ রয়েছে আরেকটি বইয়ে। সেটি লিখেছেন সালমান খুরশীদ। তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ২০১৪ সালে সালমান খুরশীদ তার লেখা বইয়ে উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশে যখন জাতীয়তাবাদী তরুণেরা এবং জামায়াতে ইসলামী ও সরকারের লোকেরা রাস্তায় লড়াই করেছিল, তখন আমরা আওয়ামী ক্যাম্পে চলে যাই।’ তার মানে হচ্ছে, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি দু’জনের বই দিয়ে এবং কথাতেই প্রমাণিত, ভারত কিভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে।

এবারো সেই হস্তক্ষেপের আলামতই দেখা যাচ্ছে। ভারতের নীতিনির্ধারক এবং মিডিয়া বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে অতি উৎসাহ দেখানোর পাশাপাশি আওয়ামী লীগকে কিভাবে আবারো ক্ষমতায় আনা যায়, সেই তৎপরতা চালাচ্ছে। এ ধরনের তৎপরতায় বাংলাদেশের মানুষের প্রতি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের অশ্রদ্ধাই প্রকাশ পাচ্ছে। ভারত একবার বলেছিল, তাদের সম্পর্ক কোনো দল বা সরকারের সাথে নয়, বাংলাদেশের জনগণের সাথে। কিন্তু সে কথাটি বেমালুম তারা ভুলে গেছে।

বরাবরই আমরা লক্ষ করেছি, বিশেষ একটি দল এবং বিশেষ একটি সরকারের সাথেই তাদের সম্পর্ক।

অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মতলবি বিশ্লেষণ এবং আওয়ামী লীগ প্রতিনিধিদলের উদ্দেশ্যমূলক ভারত সফর ইতোমধ্যে রাজনৈতিক মহলে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। বিএনপি এ সম্পর্কে প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, বাংলাদেশে যে দল বা গোষ্ঠী মানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে, তাদের ওপর আস্থা রেখে যদি ভারত এগোতে চায়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক ক্ষতির দিকে যেতে বাধ্য। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা না থাকলে সম্পর্ক খারাপ হবেই। দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত বাংলাদেশকে তার প্রভাব বলয়ে রাখতে একটি বিশেষ দলকে গুরুত্ব দিচ্ছে, যা এক সময় ভারতের জন্যই বুমেরাং হবে। ভারতের উচিত, বাংলাদেশের জনগণকে আস্থায় নেয়া এবং বাংলাদেশে যাতে সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে তাতে সাহায্য করা। ভারতকে অনুধাবন করা উচিত, বাংলাদেশ হচ্ছে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে তৃতীয় প্রধান দেশ। প্রায় সাড়ে তিন লাখ ভারতীয় নাগরিক আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে কাজ করছে। বাংলাদেশের জনগণকে আস্থায় না নিলে একদিন জনগণ এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।

খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে আগামী নির্বাচন থেকে দূরে রাখার সব ধরনের অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীনেরা তাকে অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তিনি যাতে জামিন না পান এবং রোগব্যাধিতে জর্জরিত হয়ে থাকেন, তার সব কিছুই করা হচ্ছে। তাদের ভয়, খালেদা জিয়া বাইরে থাকলে এবার ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি প্রহসন করা সহজ হবে না। তাই সাজানো মামলায় তাকে জেলে নেয়া হয়েছে। রাখা হয়েছে নাজিমুদ্দীন রোডের পরিত্যক্ত কারাগার ভবনে। তার জামিন নিয়ে সৃষ্টি করা হচ্ছে দীর্ঘসূত্রতা।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ইতোমধ্যেই বলেছেন, এ ধরনের মামলায় যেকোনো আসামির জামিন পাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু বাস্তবে বেগম খালেদা জিয়া জামিন পাচ্ছেন না। বাংলাদেশের সিআরপিসিতে ৪৯৭ ধারা নামে একটি ধারা আছে, সেই ধারায় বলা হয়েছে, যদি একজন আসামি শারীরিকভাবে অক্ষম হন অথবা তিনি যদি বয়সে প্রবীণ হন অথবা তিনি যদি মহিলা কিংবা শিশু হন, সে ক্ষেত্রে যেকোনো আসামিকে জামিন দিতে হবে। এমনকি তার বিরুদ্ধে যদি ৩০২ ধারার মামলা থাকে, তাহলেও জামিন দিতে হবে। ৩০২ ধারার মামলা হচ্ছে খুনের মামলা। খুনের মামলায়ও আসামি যদি শারীরিকভাবে অক্ষম হন, যদি মহিলা হন, প্রবীণ হন সে ক্ষেত্রে জামিন দেয়ার বিধান রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার বয়স এখন ৭৩ বছর। তিনি একজন প্রবীণ মানুষ, একজন মহিলা এবং শারীরিকভাবে অক্ষম। সিআরপিসির বিধান অনুযায়ী, তার সাথে সাথেই জামিন হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি।

দ্বিতীয়ত, বেগম খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছে পাঁচ বছর। আইনের ভাষায় পাঁচ বছরের সাজা হলো কম সময়ের সাজা। যার কম সময়ের সাজা হয়, তার সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের রায় আছে, তার আপিল গ্রহণ করে সাথে সাথে জামিন দিতে হবে। কেবল বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইন, সিআরপিসির বিধানাবলি এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কোনো কিছুই মানা হয়নি। তিনি আজ প্রায় তিন মাস ধরে কারাগারে। শুধু কারাগারেই নন, তার যে মামলার শুনানি হবে সেটি হবে আগামী ৮ মে; অর্থাৎ গ্রেফতারের তিন মাস পর।

খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘায়িত করার জন্য সরকার যে নানা ধরনের ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছে, তার আরেকটি প্রমাণ কুমিল্লার দু’টি মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে। ২৪ এপ্রিল এ মামলার জামিন শুনানির তারিখ ছিল। শুনানির পর কোর্টের আদেশে বলা হয়েছে, মামলাটির অধিকতর শুনানির জন্য আগামী ৭ জুন দিন ধার্য করা হলো। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টে ৮ মে জামিন হলেও কুমিল্লার মামলার জন্য ৭ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তেমনি আরেকটি মামলায় বকশীবাজার কোর্টে জামিনের শুনানি হবে ১৭ মে।

ইতোমধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে। ব্যক্তিগত চিকিৎসকেরা কারাগারে দেখে এসে অবিলম্বে সুচিকিৎসার জন্য তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে স্থানান্তরের সুপারিশ করেন। কিন্তু সরকার তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করছে না। সরকারের পক্ষ থেকে যে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়, তারাও খালেদা জিয়াকে দেখে এসে তার নানা ধরনের সমস্যার কথা জানান। মেডিক্যাল বোর্ড দেখে আসার পর একবার শুধু তাকে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে রক্ত পরীক্ষা ও এক্স-রে করানো হয়। আর কোনো চিকিৎসা দেয়া হয়নি। ২৪ এপ্রিল স্বজনেরা খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে এসে জানান, তার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। তিনি সিঁড়ি বেয়ে ওয়েটিং রুমে আসতে পারেন না। স্বজনেরা তার কক্ষে গিয়েই কথা বলেছেন। অসুস্থতার কারণে তাকে আদালতেও হাজির করানো হয়নি। কারা কর্তৃপক্ষ আদালতকে জানিয়েছে, হাজিরার জন্য তিনি আনফিট অর্থাৎ শারীরিকভাবে অক্ষম। ইতঃপূর্বে বেগম খালেদা জিয়ার হাঁটুতে দু’বার অপারেশন হয়েছে। তার চোখে অপারেশন হয়েছে। নতুন করে তার ঘাড় ও কোমরে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকার খালেদা জিয়াকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। নির্বাচন থেকে বাইরে রাখার জন্যই তাকে নিয়ে এমন ষড়যন্ত্র করছে সরকার। তারা চায়, ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচনী প্রহসন সম্পন্ন করে ক্ষমতা ধরে রাখতে। তবে সারা দেশে জনগণের মধ্যে যে ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠছে, ক্ষমতাসীনদের সে আশা পূরণ ততটা সহজ হবে না বলে অনেকেই মনে করেন।

Comments With Facebook